“পলিটেকনিক শিক্ষা ব্যাবস্থা চার বছর থেকে তিন বছর— এটি কোনো সংস্কার নয়; এটি হবে একটি ঐতিহাসিক ভুল,”
বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই সরকার, উন্নয়ন সংস্থা, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে স্বীকৃত— প্রচলিত সাধারণ শিক্ষা কাঠামো একদিকে যেমন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, অন্যদিকে তা বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশের নয়; বৈশ্বিক পরিসরেও এটি প্রতিষ্ঠিত যে, যে দেশগুলোতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার হার বেশি, সেসব দেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বেশি উৎপাদনশীল, দক্ষতাভিত্তিক এবং টেকসই। ফলে কারিগরি শিক্ষা আজ শুধু একটি বিকল্প নয়, বরং একটি অপরিহার্য জাতীয় কৌশল হিসেবে বিবেচিত। ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামকে তিন বছরে নামিয়ে আনার যে চিন্তা করা হচ্ছে, তা নিছক একটি নীতিগত পরিবর্তন নয়; বরং এটি একটি মারাত্মক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে, যা দেশের দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেবে।
বাংলাদেশের শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই খাতগুলোর অধিকাংশ কার্যক্রম পরিচালিত হয় মধ্যম স্তরের প্রযুক্তিবিদদের মাধ্যমে, যাদের প্রধান উৎস হলো ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষা। মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত কাজের প্রায় ৮৫ শতাংশই ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দ্বারা সম্পাদিত হয়, যা তাদেরকে দেশের উৎপাদনশীল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা উচ্চস্তরের প্রকৌশলী ও দক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করে, যেখানে বাস্তবায়ন, তদারকি, অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন হয়। ফলে এই স্তরের শিক্ষার গুণগত মান বা সময়কাল কমিয়ে দেওয়া মানে শিল্পখাতের কার্যকারিতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত হানা।
আন্তর্জাতিক শিক্ষাকাঠামোর আলোকে বিচার করলে বাংলাদেশের চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামটি একটি সুসংহত ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অবস্থানে রয়েছে। ইউনেস্কোর ISCED কাঠামো অনুযায়ী এটি পোস্ট-সেকেন্ডারি বা শর্ট-সাইকেল টারশিয়ারি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (BNQF) অনুযায়ী এটি লেভেল-৬, যা একটি পূর্ণাঙ্গ টারশিয়ারি শিক্ষা স্তর হিসেবে স্বীকৃত। এই স্তরের শিক্ষা সরাসরি উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তুলনাযোগ্য একটি মান নিশ্চিত করে। ফলে এটি স্পষ্ট যে, ডিপ্লোমা শিক্ষা কোনো নিম্নস্তরের প্রশিক্ষণ নয়; বরং এটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, কারিগরি বা ডিপ্লোমা পর্যায়ের শিক্ষার ক্ষেত্রে ‘মোট শিক্ষাবর্ষ’ বা ‘Year of Schooling’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। অধিকাংশ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এই শিক্ষার মোট শিক্ষাবর্ষ কমপক্ষে ১৪ বছর। বাংলাদেশে এসএসসি শেষে চার বছরের ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম সম্পন্ন করলে মোট শিক্ষাবর্ষ দাঁড়ায় ১৪ বছর, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু এই প্রোগ্রামকে তিন বছরে নামিয়ে আনা হলে মোট শিক্ষাবর্ষ কমে দাঁড়াবে ১৩ বছর, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিচে নেমে যাবে এবং বাংলাদেশের ডিপ্লোমা সনদের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এটি শুধু একটি অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন নয়; বরং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
একাডেমিক গভীরতা ও দক্ষতার প্রশ্নে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা প্রোগ্রামটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রোগ্রামে একজন শিক্ষার্থীকে ১৫০ থেকে ১৬০ ক্রেডিট সম্পন্ন করতে হয়, যা একটি সাধারণ ডিগ্রি (পাস) কোর্সের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে দীর্ঘ সময়ব্যাপী ল্যাবরেটরি কাজ, ওয়ার্কশপ প্রশিক্ষণ, শিল্পসংযুক্ত ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা। এই সমন্বিত কাঠামোই একজন শিক্ষার্থীকে বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনে সক্ষম করে তোলে। ফলে সময়কাল কমিয়ে দিলে এই দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সরাসরি সংকুচিত হবে এবং উৎপাদনশীল দক্ষ জনবল তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।
শিল্পভিত্তিক গবেষণাও এই বাস্তবতাকে সুস্পষ্টভাবে সমর্থন করে। বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাক্রম শিল্পক্ষেত্রের বাস্তব কাজের সঙ্গে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত Weighted Average স্কোর ৪.০ থেকে ৪.৭-এর মধ্যে, যা “খুবই প্রাসঙ্গিক” হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ বর্তমান চার বছরের কাঠামো শিল্পের প্রয়োজনীয়তা পূরণে কার্যকরভাবে কাজ করছে। এই প্রোগ্রামকে তিন বছরে নামিয়ে আনা হলে এই সামঞ্জস্য ভেঙে পড়বে এবং শিল্পক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হবে।
এই প্রস্তাবের সরাসরি প্রভাব পড়বে শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানের ওপর। বর্তমানে বাংলাদেশে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা ন্যূনতম দশম গ্রেডে চাকরিতে প্রবেশ করেন এবং একটি সম্মানজনক পেশাগত অবস্থান ভোগ করেন। কিন্তু শিক্ষার সময়কাল কমিয়ে দিলে তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, যা তাদের চাকরির গ্রেড, বেতন কাঠামো এবং সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ডিপ্লোমা গ্রাজুয়েটদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অসামঞ্জস্যও পরিলক্ষিত হয়। একদিকে সরকার কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করছে, অন্যদিকে এই শিক্ষার সময়কাল কমিয়ে তার মান ও আকর্ষণ কমিয়ে দেওয়ার চিন্তা করছে। এই দ্বৈত অবস্থান কারিগরি শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যকে ব্যাহত করতে পারে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামো বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত আরও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী আগামী বছরগুলোতে দেশের কর্মশক্তির একটি বড় অংশই হবে মধ্যম স্তরের দক্ষ প্রযুক্তিনির্ভর জনবল, যাদের প্রধান উৎস ডিপ্লোমা শিক্ষা ব্যবস্থা। এই বাস্তবতায় ডিপ্লোমা শিক্ষাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে সংকুচিত করা মানে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তিকে দুর্বল করা।
সর্বোপরি বলা যায়, চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম কোনো অতিরিক্ত সময়সাপেক্ষ কাঠামো নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত, আন্তর্জাতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং শিল্পক্ষেত্রে পরীক্ষিত একটি শিক্ষা ব্যবস্থা। একে তিন বছরে নামিয়ে আনা মানে শুধু একটি বছর কমানো নয়, বরং একটি জাতির দক্ষতা, সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সংকুচিত করা। সময়ের দাবি হলো এই শিক্ষাকে কমানো নয়, বরং আরও আধুনিক, আরও প্রযুক্তিনির্ভর এবং আরও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
চার বছর থেকে তিন বছর— এটি কোনো সংস্কার নয়; এটি হবে একটি ঐতিহাসিক ভুল, যার প্রভাব দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হবে।
মোঃ এনামুল হক
কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ।